কবি রফিকুল ইসলাম’র একগুচ্ছ কবিতা


কবি রফিকুল ইসলাম’র একগুচ্ছ কবিতা
এক।
শীতে পথশিশুর স্বপ্ন “

শীত আসে শান্ত নদীজলে রক্তিম সূর্য ডুবে
টুপটাপ শিশিরের শব্দে পাখিদের কলরবে।
শীত আসে ঘাসজমি আর গাঁয়ের আলপথে
কুয়াশা কন্যারা ছাউনি ফেলে খোলা মাঠে।

ঘরেঘরে নতুন ধানের পিঠাপুলির গন্ধ ভাসে
শীত আসে নলেন গুড়ে আর খেজুর রসে।
মৌমাছিরা ঠাণ্ডা হাওয়ায় মধু করে সঞ্চয়
শিশির ভেজা শিমফুল  লাউয়ের লতায়।

শীতের ভোর আসে কুয়াশার ধবল চাদরে
হিমে  উষ্ণতা ছড়ায় সকালের মিষ্টি রোদে।
কনকনে শীতে কাবু  কাঁপে বাবু কফিশপে
পথশিশু শুধু, একটি কম্বলের স্বপ্ন দেখে ।

দুই।
খুঁজি উষ্ণশীতের সোহাগ “

হেমন্ত ফিরে যাবে পউষের  আসার ছলে
রাতের বিন্দু বিন্দু শিশির জমে আছে
শুভ্র সুতোয় বুনা মাকড়সার জালে।

পউষের আগমনে বাতাসে হিমেল শিরশির
হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে  সাদা বক সন্ন্যাসী ধ্যানে
বিলের শাপলা পাতায় টলমল শিশির।

পউষ আসবে বলে  শাখাচ্যুত পাতা ঝরে
মাঠের  সর্ষেফুলে দোলে হলুদ ক্যানভাস
সূর্য ডুবে হিমহিম শীত নামে সন্ধ্যা ঘিরে।

হিম কুয়াশায় কাপে সারি সারি রাতের গুবাক
টুপটাপ শিশিরের শব্দে রাতের প্রহর গুণি
রাতের শয়নে খুঁজি উষ্ণশীতের সোহাগ।

কুয়াশার চাদরে রাতের আঁধার কাটে ধীরে
দুধরঙ ঘন কুয়াশায় ঢাকে জবুথবু  ভোর
ভোরের সূর্য উঠে কুয়াশার বুক চিরে।

তিন।
প্রত্যাশার কাঠগড়ায়

সময়ের বিষণ্ন চোখে ভেসে বেড়ায়
একতাল বিবাদী শূন্যতা
হাঁসের পায়ে  উঠোনে ফিরে আসে
শ্যাওলা জড়ানো অপূর্ণতা।
দুপুরের প্রখর রোদ্দুর কথা দিয়ে ছিল
এনে দেবে হলুদ বিকেলের সুখ,
ষড়ঋতু একমুঠো বুনো ফুল এনে দেবে
বলেছিল আবার বসন্ত ফিরে আসুক।
দিনগুলো সব নির্বাসনে আটকে আছে
পেরেক পোতা দেয়ালের পঞ্জিকায়,
সুখের জ্যোৎস্না আকাশে ফিরে গেছে
ঘনীভূত মেঘের কোন এক সন্ধ্যায়।
প্রশ্নরা উত্তর খোঁজে একান্ত নির্দয় সময়
গোধূলির ক্ষণিকের ক্ষীণ আভায়,
কড়ি-বর্গা খসে পড়ে ধ্বসে পড়ে  প্রাসাদ
মরামুখ ভেসে আসে ভাঙা জানালায়।
স্বপ্নরা  হারিয়েছে স্মৃতির কানাগলি পথে
তবুও আড়ষ্ট চোখ খোঁজে বারবার 
দুঃখহরণের কোন এক পুন-আয়ুর দ্বারে
যদি বসন্তবিলাসে ফিরে আসে আবার ।

চার।
রুক্ষ হেমন্তবিলাস

ভাবনার দ্বীপপুঞ্জ মাঝে ভবঘুরে পথ
খেয়ালি মনে এলোমেলো চলা
রোদে আতঙ্কে বুদবুদ চোখধাঁধা আলোর খেলা।
গোলাপ ফোটে না আর ফুলের  বাগানে
টসটসে আঙ্গুলগুলো বীজশূন্য কিশমিশ
হলুদ পাতা ঝরে এক আঁজলা জল  বিহনে ।
মৌমাছি ঘরামী বাঁধে ঘর উড়ে উড়ে ঘুরে
আর, আকবরেরা মানুষ পিটিয়ে মারে ।
জলহীন মেঘের পাশে কেবল উড়ছে গাঙচিল
নির্বিকার পুড়ছে উত্তাপে অরণ্যের বর্ণীল।
ফেরারী হয়েছে বসন্ত আমার সুগন্ধী বাতাস
পুষ্ট ফোটা বারণ;
পত্রহীন উলঙ্গ শাখায় নাচে রুক্ষ হেমন্তবিলাস।

পাঁচ।
কবির অসমাপ্ত কবিতা”
       
অসমাপ্ত কবিতার শেষ চরণটি খুঁজি
নীলফুলে প্রজাপতির রঙিন পাখায়
কালক্ষেত্রে ঋতুচক্রের বর্ষ আয়ু শেষে
মৃন্ময়ী বসন্তে কৃষ্ণচূড়ার মত্ত শাখায়।

অসমাপ্ত কবিতার শেষ চরণটি খুঁজি
অরুণোদয়ের তারুণ্যের  দীপ্ত সভায়
শেষ বিকেলের অস্তমিত ক্লান্ত সূর্যের
আবির ছড়ানো স্বপ্নীল আভায়।

আমি কবিতার শেষ চরণটি খুঁজি
সুদীর্ঘ বোধের মর্মবৃক্ষের কাছে
বন্ধন-শোকে ছুঁয়ে যায় মহাশূন্যলোক
যখন পাতা ঝরার হেমন্ত আসে।

অসমাপ্ত কবিতার শেষ চরণটি খুঁজি
ভীরুপা’য় পথচারীর মত হাঁটতে হাঁটতে
রাজপথে প্রতিবাদী শব্দের মিছিলে
চাপাতির আঘাতে শব্দের বুকে রক্তঝরে
আহত শব্দেরা কড়া নাড়ে মনো-দ্বারে।

আমি—
অসমাপ্ত কবিতার শেষ চরণটি খুঁজি
তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফের নদীজলে
পৃথিবীর উদয়াচল থেকে অস্তাচলে,
কবি হাঁটুগেড়ে বসে পিশাচের রোষানলে।

বর্ণমালা ম্যাগাজিন

বর্ণমালা ম্যাগাজিন

প্রযুক্তির উঠোনে অনুভবের বসবাস

Leave a Reply

Your email address will not be published.